সুনামগঞ্জ , রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
‎বেলার মামলা নিয়ে কক্সবাজারের উন্নয়ন নিয়ে উদ্বেগে সরকার: মীর শাহে আলম ভেরিফিকেশনের নামে ফ্যাসিবাদী আমলের অপকর্ম পরিত্যাগ করুন : জামায়াত আমির আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে সিজার, বেসরকারি ক্লিনিকে ৮২ শতাংশের বেশি, ১৯ মাসে ৫ হাজার ৬২৪ সিজার জামালগঞ্জে ৪টি স্টোন ক্রাশারকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা জরিমানা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির ত্রি-বার্ষিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত দোয়ারাবাজারে চলছে টিলা কেটে মাটি বিক্রি সুপারিশ পেয়েও চাকরি নেই ১২০ জনের, ডিসি’র বাসভবনের সামনে নিয়োগবঞ্চিতদের বিক্ষোভ অসহায় ২০ নারীর হাতে কর্মসংস্থানের উপকরণ তুলে দিল বসুন্ধরা শুভসংঘ ভূমধ্যসাগর থেকে এক সপ্তাহে ১৬০ বাংলাদেশি উদ্ধার এক কলসি পানির জন্য পাড়ি দিতে হয় এক কিলোমিটার পথ দুই ড্রেজারে মনাই নদীর বালু লুট, ভাঙনের হুমকিতে বসতবাড়ি, বোরো জমি মসজিদে নামাজরত যুবককে ছুরিকাঘাত, বাঁচাতে গিয়ে পিতা আহত বিকাশ -লিপি- সানোয়ারা দিরাই'র গুনি শিক্ষক ঢাকায় আন্তর্জাতিক মানের গলফ ও বিনোদনের নতুন কেন্দ্র বসুন্ধরা সুপার গলফ জামায়াত অকৃতজ্ঞ, খালেদা জিয়ার দেওয়া মন্ত্রিত্বের কথা ভুলে গেছে : প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ‎জামালগঞ্জে প্রাথমিক শিক্ষায় অবদানের গুণী স্বীকৃতি পেলেন ৩ শিক্ষক তিন দিনব্যাপী উৎসব শুরু, ২৮ বছরের পথচলায় লোকদল শিল্পীগোষ্ঠী ছাতকে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির সংঘর্ষে আহত ৫০ দিরাই পৌরসভা প্রতিষ্ঠার ২৭ বছর, নাগরিক সুবিধা সেই তিমিরে ছাতকে অনুমোদনহীন দুই শতাধিক চুনের কারখানা

গারো সম্প্রদায়ের ওয়ানগালা বা নবান্ন উৎসব

  • আপলোড সময় : ৩০-১১-২০২৫ ০১:৩৫:৩৯ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ৩০-১১-২০২৫ ০১:৪৭:৩১ পূর্বাহ্ন
গারো সম্প্রদায়ের ওয়ানগালা বা নবান্ন উৎসব
পলাশ চিছাম:>
খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের পূর্বে গারো সম্প্রদায় বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করতেন। তাদেরকে সাংসারেক বা প্রকৃতির পূজারী বলা হতো। তারা বিশ্বাস করতেন তাতারা মিদ্দি দেবতাদের সবচেয়ে বড় দেবতা। আর সেই সময় গারোরা যে সমস্ত রীতি-নীতি, নিয়ম-কানুন ও অনুষ্ঠানাদি পালন করতেন সেগুলোকেই গারো দাংনি দাকবেওয়াল বা গারোদের করণীয় কাজ বলা হয়। গারো সম্প্রদায় যে সমস্ত দাকবেওয়াল পালন করে আসছে তার মধ্যে ওয়ানগালা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বড় উৎসব। আগের দিনে তিন দিন হতে এক সপ্তাহ পর্যন্ত এ ওয়ানগালা উৎসব চলতো।
সমগ্র গারো সমাজকে ১৩ টি ভাগে ভাগ করা যায় সেগুলো হলো (১) আখাওয়ে/আওয়ে, (২) আবেং, (৩) আত্তং, (৪) রুগা, (৫) চিবক, (৬) চিসক্;, (৭) দোয়াল, (৮) মাচ্ছি, (৯) কচ্ছু, (১০) আতিয়াগ্রা, (১১) মাৎজাংচি/মাত্তাবেং, (১২) গারা গান্চিং, (১৩) মেগাম। এছাড়াও গারো সমাজে ব্রাক, শমন, দলি, গন্ডায় নামে আরো ৪ টি ছোট দলের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
এই দলগুলোর মধ্যে আচার ব্যবহার, খাদ্যাভ্যাস, কথ্য ভাষা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বেশ কিছু পার্থক্য ও বৈচিত্র পরিলক্ষিত হয়।
ওয়ানগালা বা নবান্ন কী? : আগের দিনে জুম থেকে যে কোন শস্য বা ফল উৎপাদনের পর নিজে খাওয়ার পূর্বে দেবতার নামে নতুন শস্য উৎসর্গ করে একটা অনুষ্ঠান করা হত; একেই গারো ভাষায় ‘ওয়ানগালা’ বলা হয়। যাকে বাংলায় বলা যায় ‘নবান্ন উৎসব’। কথিত আছে পুরাকালে আশি ও মালজা নামে স্বামী স্ত্রী ছিলেন। গ্রামের সবাই নতুন ফসল ঘরে তুলার পূর্বে দেবতাকে উৎসর্গ করে ওয়ানগালা অনুষ্ঠান করলেও আশি ও মালজা বিশ্বাস না করে নতুন ফসল ঘরে তুলার পূর্বে দেবতাকে উৎসর্গ না দিয়েই খেয়ে ফেলল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস সে দিনই বিকেল হতে না হতেই স্বামী আশি বনে কাঠ কাটতে গেলে তাকে বাঘ মেরে ফেলে এবং স্ত্রী মালজা নদীতে পানি তুলতে গেলে তাকে কুমিরে খেয়ে ফেলে। তাদের এই অকাল মৃত্যু দেখে গ্রামবাসীরা দেবতাকে উৎসর্গ না দিয়ে শস্য বা ফল খাওয়ার শাস্তি হিসেবে ধরে নেয়। সেই হতে গারো সমাজে এই বিশ্বাস চলে এসেছে যদি কেউ মারাত্মক পাপে লিপ্ত হয় তবে তার অপঘাতে মৃত্যু অনিবার্য। এরকম পাপে লিপ্ত ব্যক্তির আইন আদালতে বিচারের কোন প্রয়োজন হয় না বিবেক দংশনই তার উপযুক্ত শাস্তি। সালজং ও সুসিমে (সূর্য-চন্দ্র) তাদের চরম শাস্তি প্রদান করে। তখন থেকেই গারোরা প্রতি বছর নতুন ফসল ঘরে তুলার সাথে সাথে ওয়ানগালা উৎসব পালন করে আসছে।
ওয়ানগালা উৎসব উৎপত্তি : গারোদের গুরুত্বপূর্ণ প্রধান উৎসব হলো ‘ওয়ানগালা’। এই ওয়ানগালার উৎপত্তি নিয়ে নানা মতামত রয়েছে। গারোরা পৌরাণিক কাহিনীতে বিশ্বাস করে যে, স্রস্টা বিশ্বচরাচর সৃষ্টির পর বিশ্ব চরাচরের সৌন্দর্য দেখে অত্যন্ত বিমুগ্ধ হলেন। সৃষ্ট জীবজগতের কল্যাণ কামনায় তিনি আনন্দ ও মহা উৎসবের আয়োজন করলেন। সেখানে তিনি সকল প্রাণীকুলকে আমন্ত্রণ করলেন যাতে সকলে মিলে আনন্দ উৎসব পালনের নিয়ম/পদ্ধতি জেনে নিতে পারেন এবং পরবর্তীতে এ উৎসবের আয়োজন করতে পারেন। বিশ্ব চরাচরের স্রষ্টা যাকে ‘তাতারা-রাবুগা-নন্তু-নপান্থ’ নামে গারো সম্প্রদায় জানে ও বিশ্বাস করে, তার আহবানে প্রাণীকুল সবাই “দাগিপানী আসং আম্বিনী চিগাতে” নামক স্থানে একত্রিত হয়ে আনন্দ উৎসবে অংশগ্রহণ করলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় কেবল বাদ পড়লো মানবজাতি। তাদের প্রতিনিধি হিসেবে আসি ও মালজা নামের যে দু’জনকে উৎসবে যোগদানের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল তারা রওয়ানা দিয়ে পথে পাপাচারে লিপ্ত হয়ে অপঘাতে মৃত্যুবরণ করে। পরবর্তীকালে ‘দোমাসেকী’ বা দোয়েল পাখির কাছে গারোরা ওয়ানগালা উৎসবের রীতি-নীতি শিখে নিয়ে বর্তমান পর্যন্ত পালন করছে। আবার জনশ্রুতি আছে ওয়ানগালা উদযাপনের পর কিছু মাছ বিভিন্ন রঙে সজ্জিত অবস্থায় নেশার ঘুরে মানবজাতির বসতিতে এসে ঘুমিয়ে পড়ে। মানুষজন তাদেরকে এমন সাজে সজ্জিত দেখে জিজ্ঞেস করেন, তোমরা এভাবে সেজে কোথা হতে এসেছ? মাছগুলো ওয়ানগালা উদযাপনের সকল বিষয় বর্ণনা করল এবং বলল অনুষ্ঠান শেষে কিছু নেশা জাতীয় পানি পান করার ফলে তারা ভুলবশতঃ মানব বসতিতে চলে এসেছে। তখন থেকে মাছের কাছ থেকে শোনা বর্ণনানুযায়ী গারোরা ওয়ানগালা পালন করে আসছে।

ওয়ানগালা উৎসব পালনের ধাপ : ওয়ানগালা উৎসব পালনে তিনটি ধাপ অনুসরণ করা হয় যথা- (ক) রু-গালা, (খ) জল আন্না ও (গ) বি.সি-রি.ওয়াত্তা। (ক) রুগালা : গারো সম্প্রদায় রু-গালা সাধারণত জুম ক্ষেতের ধান কাটার পর ১৫ কার্তিক উদ্যাপন করে থাকে। ১৫ ভাদ্রকে জা-মারাং বা কু-মাস হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ঠিক তার দুমাস পর এ ওয়ানগালা উৎসব আয়োজন করা হয়। এ অনুষ্ঠানের প্রথমেই ‘গাত্তা’ বা ঘরে ওঠা অনুষ্ঠান করা হয়। ‘আখিং নকমার; (গ্রাম প্রধান/মাতব্বর) গৃহে সকলে সমবেত হয় এবং দামা নক্-গাত্তার মাধ্যমে বা দামা/ঢোল গৃহে তোলার মাধ্যমে শুরু হয়। খামাল বা পুরোহিত এসময় রুগালা উদ্বোধন করেন আ-হা-হু-য়া বা উল্লাস ধ্বনি এর মাধ্যমে। আখিং নক্মার ঘরের এক কোণা থেকে চু-বিচ্চি বা পঁচুই মদ মাটিতে ঢেলে আ-হা-হু-য়া শব্দ উচ্চারণের করা হয়। ওয়ানগালায় সমবেত সকল পুরুষরা তখন আনুষ্ঠানিকভাবে দামা হাতে নেয়। সমতালে তারা দামা বাজানো শুরু করে। অবস্থাপন্ন লোকেরা ঐ দিন শূকর ও গরু মেরে তার মাংস গ্রামবাসীর মধ্যে বিলিয়ে দেন। আবার যাদের অবস্থা ভাল নয় তারাও চাঁদা তোলে একত্রে বড় শূকর বা গরু কিনে ঐ দিন মেরে মাংস ভাগ করে নেয়। ঐ দিন সকলের বাড়িতেই মাংস রান্না করে ভুরি ভোজন করা হয়। (খ) জল আন্না : গারো সম্প্রদায় মিসি সালজং এর জন্য ‘জল আনা’ উৎসর্গ করে থাকে ওয়ানগালার দ্বিতীয় দিনে। জল আনা অনুষ্ঠানে দেবতার উদ্দেশ্যে ‘সাসাৎ সো.আ’ বা ধূপ প্রজ্বলন অনুষ্ঠান করা হয়। ‘সাসাৎ সো.আ’ বা ধূপ প্রজ্বলন কালে খামাল বা পুরোহিত সবার সম্মুখে দেবতার নিকট আশীর্বাদ যাচনা করে মন্ত্র উচ্চারণ করেন। এসময় খামাল বা পুরোহিত ধূপ পাত্র চুমু দিয়ে ‘চগারী’ বা উৎসর্গ দেয়।
এখানে উল্লেখ্য যে, যখন ধূপ বা সাসাৎ জ্বালানো হয় তখন যদি ধপ করে আগুন জ্বলে উঠে তখন ধরে নেয়া হয় যে এবছর ভাল যাবে। আবার ধূপ জ্বালানোর সময় যদি আগুন না জ্বলে শুধু ধোঁয়া নির্গত হয়; তখন ধরে নেওয়া হয় যে আগামী বছর খুব ভালো যাবে না। এভাবেই খামাল বা পুরোহিত জল আন্নার মাধ্যমে ভবিষ্যত বছর গণনা করতেন। (গ) বি.সি-রি ওয়াত্তা : বি.সি-রি ওয়াত্তা অনুষ্ঠান ওয়ানগালার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গারোদের ‘মিসি সালজং’ দেবতাকে বিদায় জানানো হয় ওয়ানগালা পার্বণের তৃতীয় দিনে দিবসটি পালন করার মাধ্যমে। ওয়ানগালায় সমবেত জনগণ সকল কাজের জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন কৃতজ্ঞভরে। এ পর্বকে অনেকটা বিদায় পর্ব বলা যায়। সারা বছর জীবনদানকারী ও শষ্য দানকারী দেবতাদের প্রশংসা ও ধন্যবাদের দিন। পাশাপাশি গভীর আগ্রহভরে দেবতাকে আগামী বছরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। গারোদের মিদ্দি বা দেবতা প্রায় ২০৮ প্রকার। তার মধ্যে মিসি সালজং, তাতারা রাবুগা, সুসুমি, বিদাউই, গোয়েরা, রাগ্গাসী, বা-গিপা, ব্রা-রা, চুরাবুদি, আসি-জগো ইত্যাদি প্রধান। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পার্বণে দেবতাদের পূজা দেয়া হয়। ওয়ানগালা উৎসবে শস্য দেবতাকেই মূলত ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয়। ওয়ানগালার বিভিন্ন ভঙ্গির নাচ : ওয়ানগালায় বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশিত হয়। সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী লোকগীতি আজিয়া, দরুয়া, রে-রে প্রভৃতি গেয়ে উৎসব করে। এছাড়াও এ সময় বিভিন্ন ভঙ্গিতে নাচ পরিবেশন হয়ে থাকে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-গ্রং দক্আ (শিং বাজানো), সালাম কা’আ (নমস্কার জানানো), ডক্রু সু-আ (ঘুঘু পাখির লড়াই), দুরাতা রাত্তা (উঁচুতে লম্বমান শস্যের শীষ সংগ্রহ), অপিং রাত্তা (আগাছার মূলোৎপাটন), আজেমা রুআ (পথ প্রদর্শনী নুত্য), দামা জাজকা (দামা/ঢোল পরিবর্তন), রুয়ে আমা (প্রবীণা সেজে তরুণীদের নৃত্য), নমিল পান্থে সাল্লিদিংআ (তরুন-তরুণীদের পরস্পরকে আকর্ষণ), বারা সুগালা (কাপড় ধোয়া), দোসিক্ মেগারো চাআ (টিয়া পাখি কর্তৃক যবের শীষ আহার), দামা গংআ (সমান্তরালভাবে দামা সাজানো), নমিল্ খাম্বি থুআ (তরুণী কর্তৃক উচ্চতা মাপা), চাম্বিল্ মেসা (চাম্বল ফলের নাচ), আমাক্ মিখপ্ চাআ (বানর কর্তৃক ভুট্টা আহার), আমব্রেতং খল্লা (আমড়া কুড়ানো), নমিল জাজং নিদুআ (তরুণী কর্তৃক চাঁদ দেখা), খিল্ পুআ (তুলা বীজ বপন), চু খান্না (মদ খাওয়ানো), চামে চাংআ (প্রেমিকাকে অনুসরণ), মাৎমা সিআকু শগিন চাআ (শকুন কর্তৃক মরা মহিষ আহার), জিক্ সেক্আ (স্ত্রী হরণ), দোমি গংআ(মোরগের লেজ নোয়ানো), মাকবিল রোআ (ভাল্লুকের নৃত্য), খিল্ অক্আ (তুলা সংগ্রহ), নমিল্ বারা দন্নুয়া (তরুণী কর্তৃক কাপড় লুকানো), মেমাং মি সুআ (ভূত-পেতœী কর্তৃক ধান ভানা), নমিল্ মিক্খাং দন্নুয়া (তরুণী মুখ লুকানো), চাওয়ারী সিক্আ (জামাই ধরা)। গারোদের ওয়ানগালা বা নবান্ন উৎসব তাদের জীবনের আনন্দ, ঐক্য ও সংস্কৃতির প্রতীক। নতুন ফসল ঘরে তোলার পর তারা তাদের দেবতা ‘সালজং’-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এই উৎসব পালন করে। নাচ, গান, দামা বা ঢোলের তালে তালে উৎসবের পরিবেশ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। এটি শুধু কৃষি নির্ভর আনন্দোৎসব নয়, বরং গারো সমাজের ঐতিহ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক বন্ধনের প্রকাশ। ওয়ানগালা উৎসব গারোদের জীবনধারা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে অমলিন রাখে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। আর তারা তাদের এই ঐতিহ্য, জীবনধারা ও সংস্কৃতি নিয়ে স্বপ্ন দেখে ও লালন করে তাকিয়ে থাকে অনাগত ভবিষ্যতের দিকে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সম্ভবত ১৮৬০-১৮৭০ খ্রি: ইউরোপ ও আমেরিকা হতে মিশনারীরা গারো পাহাড়ে আসেন খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচার করার জন্যে। তখন মহান ঈশ^রের প্রতি বিশ^াস, ভক্তি রেখে ধীরে ধীরে গারো সম্প্রদায় খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেন এবং ওয়ানগালা বা নবান্ন উৎসবে বিভিন্ন শস্য ঈশ^রের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে থাকেন। পরবর্তীতে মাতামন্ডলী এসময়কে ‘খ্রিষ্ট রাজার পর্ব’ হিসেবে ঘোষণা করেন যাতে আমরা খ্রিষ্টরাজা যীশুকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতে পারি। এটি প্রতি বছর নভেম্বর মাসের শেষে রবিবারে খ্রিষ্টরাজার পর্ব হিসেবে উদযাপিত হয়ে থাকে। এই দিনে খ্রিষ্টানরা যিশু খ্রিষ্টকে ‘সমগ্র বিশ্বের রাজা’ হিসেবে স্মরণ ও সম্মান জানায়। বিশ্বাস করা হয়, যিশু খ্রিষ্ট মানবজাতির মুক্তি ও শান্তির জন্য আত্মত্যাগ করেছিলেন এবং তাঁর প্রেম, ন্যায় ও সত্যের মাধ্যমে তিনি মানব হৃদয়ে রাজত্ব করেন। খ্রিষ্ট রাজার পর্ব খ্রিষ্টানদের হৃদয়ে ঈশ্বরের প্রতি গভীর বিশ্বাস ও ভক্তি জাগ্রত করে। এটি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের রাজত্ব শক্তি বা ক্ষমতায় নয়, বরং ভালোবাসা, ন্যায় ও ত্যাগে নিহিত। এই উৎসবের মাধ্যমে খ্রিষ্টানরা যিশু খ্রিষ্টের প্রেম ও শান্তির বার্তা নবভাবে উপলব্ধি করে এবং মানবকল্যাণে জীবন উৎসর্গের প্রতিজ্ঞা নেয়।

[লেখক : পলাশ চিছাম, অধ্যক্ষ, স্যানক্রেড প্যারামেডিক ইনস্টিটিউট]
তথ্যসূত্র : ১। গারোদের সমাজ ও সংস্কৃতি, সুভাষ জেংছাম। ২। গারো ঐতিহ্যবাহী ওয়ানগালা উদ্যাপন ২০১৯, ‘রাজধানীতে গারোদের ওয়ানগালা উৎসব উদযাপন ও ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক চর্চা’, থিওফিল নকরেক। ৩। প্রাচীন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে সংগৃহীত।

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে সিজার, বেসরকারি ক্লিনিকে ৮২ শতাংশের বেশি, ১৯ মাসে ৫ হাজার ৬২৪ সিজার

আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে সিজার, বেসরকারি ক্লিনিকে ৮২ শতাংশের বেশি, ১৯ মাসে ৫ হাজার ৬২৪ সিজার